ঈশ্বরদী-পাবনা-ঢালারচর

সতেরোশ কোটি টাকায় নির্মিত রেলপথ থেকে মাসে আয় ১৫ লাখ টাকা

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্মাণ করা হয় ঈশ্বরদী-পাবনা-ঢালারচর রেলপথ। প্রয়োজনীয় অবকাঠামোসহ ৭৯ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথটি নির্মাণে খরচ হয় ১ হাজার ৭৩৭ কোটি টাকা।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্মাণ করা হয় ঈশ্বরদী-পাবনা-ঢালারচর রেলপথ। প্রয়োজনীয় অবকাঠামোসহ ৭৯ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথটি নির্মাণে খরচ হয় ১ হাজার ৭৩৭ কোটি টাকা। ২০১৮ সালে রেলপথটির নির্মাণকাজ শেষ হয়। এ পথে ট্রেন চলাচল শুরু হয় ২০২০ সালে। তখন থেকে এক জোড়া ট্রেন চলছে এ রেলপথে। বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্য বলছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ঈশ্বরদী-ঢালারচর রেলপথের ১১টি স্টেশন থেকে আয় হয়েছে ১ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। এ হিসাবে প্রতি মাসে গড়ে আয় হচ্ছে মাত্র ১৫ লাখ টাকা।

এ আয়ের বিপরীতে রেলপথটি রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনে কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে, সে তথ্য বাংলাদেশ রেলওয়ের কাছে পাওয়া যায়নি। তবে রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রেলপথ ও অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিচালনার দায়িত্বে থাকা কর্মীদের বেতন-ভাতা, ট্রেন পরিচালনায় যুক্ত কর্মীদের বেতন-ভাতা এবং ট্রেনের জ্বালানি খরচ বিবেচনায় নিলে ঈশ্বরদী-ঢালারচর রেলপথ থেকে প্রত্যাশিত রাজস্ব অর্জিত হচ্ছে না। উল্টো ট্রেন পরিচালনা করে লোকসান হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন তারা।

বাংলাদেশ রেলওয়ের কাছ থেকে পাওয়া এক হিসাবে দেখা গেছে, এ রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার জন্য জনবলের সংস্থান রাখা হয়েছে ১ হাজার ১২১ জনের। বিভিন্ন গ্রেডের এ কর্মীদের বেতন-ভাতা পরিশোধে বছরে দরকার হয় ৬৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতি মাসে কর্মীদের বেতন বাবদ প্রয়োজন সাড়ে ৫ কোটি টাকা। তবে যত জনবলের সংস্থান রাখা হয়েছে, বাস্তবে নিয়োগকৃত জনবল রয়েছে হাতেগোনা। এ রেলপথে বর্তমানে মাত্র ৬৫ জন কর্মরত রয়েছেন। এর মধ্যে তিনজন স্টেশনমাস্টার, তিনজন পয়েন্টসম্যান, ৩০ জন গেটম্যান, ১৫ জন পোর্টার, সাতজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও সাতজন বুকিং সহকারী।

রেলপথটিতে ঢালারচর এক্সপ্রেস নামে এক জোড়া ট্রেন চলাচল করে। ঢালারচর এক্সপ্রেস-৭৭৯ নামের ট্রেনটি সকাল ৭টা ২৫ মিনিটে ঢালারচর থেকে ছেড়ে বেলা ১১টায় রাজশাহী পৌঁছায়। একই ট্রেন (ঢালারচর এক্সপ্রেস-৭৮০) রাজশাহী থেকে বিকাল সাড়ে ৪টায় ছেড়ে ঢালারচর পৌঁছায় রাত ৮টা ১৫ মিনিটে। ট্রেনটি চলে সপ্তাহে ছয়দিন। ঈশ্বরদী-ঢালারচর রেলপথের ১১টি স্টেশন থেকে যে আয় হয়, তা মূলত এই ট্রেনটিতে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের মাধ্যমে।

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে রেলওয়ের অপারেশন শাখার একজন কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে জানিয়েছেন, ঈশ্বরদী-ঢালারচর রেলপথ প্রকল্পটি গ্রহণের সময় বলা হয়েছিল চালুর পর প্রতিদিন এ পথে ১০টি ট্রেন চলবে। কিন্তু রেলপথটি চালুর সাত বছর হতে চললেও একটির বেশি ট্রেন চলাচল করছে না। ট্রেনটির (ঢালারচর এক্সপ্রেস) জ্বালানি ব্যয় ও রানিং স্টাফদের বেতন-ভাতা বাবদ আয়ের একটি বড় অংশ চলে যায়। এ রেলপথ থেকে রাজস্ব আয় সামান্যই।

স্থানীয় কিছু মানুষের যোগাযোগে সুবিধা হওয়া ছাড়া ঈশ্বরদী-ঢালারচর রেলপথটি দেশের অর্থনীতিতে তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না বলে মনে করেন এ কর্মকর্তা।

সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‌কাঙ্ক্ষিত আয় না হওয়া এ প্রকল্পের অন্যতম দুর্বল দিক।

বিপুল টাকা খরচে নির্মাণ করা রেলপথটি বর্তমানে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয়ের একটি অবকাঠামো হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন পরিবহন অবকাঠামো বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান। তিনি এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌যেকোনো বিনিয়োগের অন্যতম উদ্দেশ্য থাকে সেখান থেকে রিটার্ন পাওয়া। বিপুল অর্থে নির্মিত ঈশ্বরদী-ঢালারচর রেলপথটি দেশের অর্থনীতিতে কী প্রভাব ফেলছে, তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। রেলপথটি নির্মাণের আগে যাত্রী চাহিদা নিরূপণ করা এবং সামগ্রিকভাবে প্রকল্পটি দেশের অর্থনীতির জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা যথাযথভাবে সমীক্ষার প্রয়োজন ছিল।’

একই ধরনের কথা বলেছেন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। এ প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌প্রকল্পটি কেউ একজন নিয়ে গেছে ঢালারচরে। সেখানে রেলপথ নির্মাণ করলে কী লাভ হবে, কী সুবিধা হবে সেই বিষয়টা তারা বিবেচনা করেনি। বিগত সময়ে আমরা দেখেছি প্রকল্প নেয়ার ক্ষেত্রে এসব বিষয় উপেক্ষিত থাকত।’

তিনি আরো বলেন, ‘‌ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি এড়াতে ইন্টিগ্রেটেড মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করছি। এ মহাপরিকল্পনায় দেশের কোথায় কী ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রয়োজন তা নিরূপণ করা হচ্ছে। কোথায় সড়ক দরকার, কোথায় রেল দরকার, কোথায় নৌপথ তৈরি করা দরকার—সেটা এই মহাপরিকল্পনায় উল্লেখ থাকবে।’ ভবিষ্যতে প্রকল্প নেয়ার ক্ষেত্রে এ মহাপরিকল্পনা অনুসরণ করলে ঈশ্বরদী-ঢালারচর রেলপথের মতো প্রকল্পের পুনরাবৃত্তি এড়ানো সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি।

আরও